উপমহাদেশের ইসলামী আন্দোলনে হযরত আল্লামা আবুল লতিফ চৌধুরী ফুলতলী
উপমহাদেশের ইসলামী আন্দোলনে হযরত আল্লামা আবুল লতিফ চৌধুরী ফুলতলী (রহঃ)
উপমহাদেশের ইসলামী ইতিহাসে যেসব বুজুর্গ আলেম ইলম, আমল ও আখলাকের সমন্বয়ে মুসলিম সমাজকে সঠিক দিশা দেখিয়েছেন, হযরত আল্লামা আবুল লতিফ চৌধুরী ফুলতলী (রহঃ) তাঁদের অন্যতম। তিনি ছিলেন একাধারে আলেমে দ্বীন, ইসলামী চিন্তাবিদ, দাঈ ও আত্মশুদ্ধির পথপ্রদর্শক। তাঁর ইন্তেকালের ১৮ বছর পরও তাঁর জীবন ও কর্ম মুসলিম সমাজে গভীর প্রভাব রেখে চলেছে।
সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার ফুলতলী গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত ও দ্বীনদার পরিবারে তাঁর জন্ম। শৈশব থেকেই ধর্মানুরাগী পারিবারিক পরিবেশে বেড়ে ওঠার ফলে তাঁর চরিত্রে ইবাদত, শালীনতা ও নৈতিকতার দৃঢ় ভিত্তি গড়ে ওঠে। এই মূল্যবোধই পরবর্তী জীবনে তাঁকে একজন আদর্শ আলেম ও সমাজসংস্কারকে পরিণত করে।
শিক্ষাজীবনের শুরুতে তিনি তাঁর চাচাতো ভাই ফাতির আলীর নিকট প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। এরপর ফুলতলী মাদ্রাসায় অধ্যয়নের মাধ্যমে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হয়। ১৩৩৮ বঙ্গাব্দে বদরপুর সিনিয়র মাদ্রাসা থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার পর তিনি রামপুর আলিয়া ও মাতলাউল উলুম মাদ্রাসায় উচ্চতর ইসলামি শিক্ষায় মনোনিবেশ করেন। হাদিস শাস্ত্রে তাঁর অসাধারণ মেধা ও অধ্যবসায় তাঁকে দ্রুত স্বাতন্ত্র্যপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে যায়।
১৩৫৫ হিজরি সালে মাতলাউল উলুম মাদ্রাসা থেকে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করে তিনি হাদিস শরীফের সর্বোচ্চ সনদ অর্জন করেন। তাঁর শিক্ষাগুরুদের মধ্যে আল্লামা খলিলুল্লাহ রামপুরী, আল্লামা ওয়াজিহুদ্দীন রামপুরী, শাহ আব্দুর রউফ করমপুরী ও শায়খুল কুররা আহমদ হেজাযী বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯৪৬ সালে ইলমে কিরাতের সর্বোচ্চ সনদ লাভের মাধ্যমে তিনি কিরাত শাস্ত্রেও একজন স্বীকৃত আলেম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।
দাওয়াত ও ইসলামী কার্যক্রমে আল্লামা ফুলতলী (রহঃ) ছিলেন নিরলস ও আপসহীন। তাঁর ওয়াজ ও নসিহতে কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর আলোকে বাস্তবমুখী দিকনির্দেশনা ফুটে উঠত। বিদআত ও কুসংস্কার পরিহার, সুন্নাহ অনুসরণ এবং উত্তম চরিত্র গঠনের ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল তাঁর দাওয়াতি সফর ও কার্যক্রম।
দীনি শিক্ষা বিস্তারে তাঁর অবদান ছিল সুদূরপ্রসারী। তিনি বিভিন্ন মাদ্রাসা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে অসংখ্য যোগ্য ছাত্র গড়ে তুলেছেন। আজ তাঁর ছাত্ররা দেশে ও বিদেশে আলেম, শিক্ষক, খতিব ও দাঈ হিসেবে দ্বীনের খেদমতে নিয়োজিত আছেন। তাঁরাই মূলত তাঁর চিন্তা ও আদর্শের ধারক ও বাহক।
তাসাউফের ক্ষেত্রে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল কুরআন-সুন্নাহনির্ভর ও ভারসাম্যপূর্ণ। আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া, ইখলাস ও আল্লাহভীতি ছিল তাঁর নসিহতের মূল বিষয়। অহংকার, আত্মপ্রচার, লোভ ও হিংসা থেকে দূরে থাকার শিক্ষা তিনি বারবার তুলে ধরতেন, যা আজকের সমাজের জন্যও সমান প্রাসঙ্গিক।
এই মহান আলেমের ইন্তেকালে মুসলিম সমাজ একজন অভিভাবকতুল্য ব্যক্তিত্বকে হারালেও তাঁর ইলমি খেদমত, আদর্শ ও প্রশিক্ষিত ছাত্রদের মাধ্যমে তাঁর উত্তরাধিকার আজও জীবন্ত। আগামী ১৫ জানুয়ারি ২০২৫ অনুষ্ঠিতব্য তাঁর ১৮তম ইসালে সওয়াব মাহফিল সেই ধারাবাহিক স্মরণ ও আত্মসমালোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। এটি শুধু স্মরণানুষ্ঠান নয়; বরং তাঁর আদর্শকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার একটি সুযোগ।
হযরত আল্লামা আবুল লতিফ চৌধুরী ফুলতলী (রহঃ)-এর জীবন আমাদের শিক্ষা দেয় যে খাঁটি নিয়ত, সহিহ ইলম ও উত্তম আখলাকই দ্বীনের প্রকৃত সৌন্দর্য। তাঁর স্মরণে আয়োজিত এই মাহফিল হোক আমাদের ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক জীবনে সেই আদর্শ বাস্তবায়নের এক নবায়িত অঙ্গীকার।
আল্লাহ তাআলা তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন এবং আমাদের সবাইকে তাঁর শিক্ষা অনুযায়ী জীবন পরিচালনার তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : আবিদ কাওসার
কবি ও সংগঠক





































