সোমবার , ০২ নভেম্বর ২০২৬
Monday , 02 November 2026
২০২৬৭ ২০২৬৩ ২০২৬১

প্রকাশিত: ১৫:৩৬, ২ নভেম্বর ২০২৬

কুইন মেরী ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনে রবীন্দ্রগানের গীতি-আলেখ্য অনুষ্ঠিত

কুইন মেরী ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনে রবীন্দ্রগানের গীতি-আলেখ্য অনুষ্ঠিত

কুইন মেরী ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনে রবীন্দ্রগানের গীতি-আলেখ্য অনুষ্ঠিত


কুইন মেরী ইউনিভার্সিট অব লন্ডন, স্বাধীনতা ট্রাস্ট ইউকে এবং গীতবীণার যৌথ উদ্যোগে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ইউরোপ ভ্রমণের শতবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্টস ওয়ানের স্টুডিওতে একটি বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত হয়।

শনিবার (৩১ অক্টোব) সন্ধ্যায় অনুষ্ঠানের শুরুতে আয়োজকদের পক্ষে স্বাগত বক্তব্য রাখেন গীতবীণার প্রধান উপদেষ্টা বাতিরুল হক সরদার।

এরপর শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন কুইন মেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর অ্যালেস্টার ওয়েনস।

মূল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রারম্ভে স্বাধীনতা ট্রাস্ট ইউকের ভ্যালেন্টাইন হার্ডিং কবিগুরুর রচনা থেকে পাঠ করে শোনান।

এরপর গীতবীণার নিবেদন গীতি আলেখ্য "গানে গানে তব বন্ধন যাক টুটে" শুরু হয়। আলেখ্যটির মূল ভাবনা, গবেষণা ও ধারা বর্ণনায় ছিলেন ভারতের বিশিষ্ট রবীন্দ্র গবেষক ও লেখক-প্রাবন্ধিক পীতম সেনগুপ্ত ।

সংগীত পরিবেশনায় ছিলেন রুমি হক, মিতালী বনোয়ারি ও সুনীতা চৌধুরী।

নির্ধারিত চারটি রবীন্দ্র-সংগীতভিত্তিক মূল রাগাংশ পরিবেশনায় ছিলেন বুধাদিত্য ভট্টাচার্য।

তবলা সংগতে ছিলেন- সন্দীপ চক্রবর্তী ও সংগীত পরিচালনায় ডক্টর শ্যামল চৌধুরী ।

গীতি আলেখ্যর সমাপ্তির পর স্বাধীনতা ট্রাস্টের ডাইরেক্টর ডক্টর আনসার আহমেদ উল্লাহ উপস্থিত সকলের উদ্দেশ্যে ধন্যবাদ জ্ঞাপন জানান।

গীতবীণার পক্ষ থেকে অনুষ্ঠানের শেষে বিশেষ সম্মাননা জানানো হয়েছে স্বাধীনতা ট্রাস্টের চেয়ারপারসন জামিল আহমেদ, সঙ্গীত শিল্পী ও শিক্ষক ডঃ শ্যামল চৌধুরী এবং পীতম সেনগুপ্তকে।

পরিশেষে অনুষ্ঠিত গীতি-আলেখ্যর প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য কিছু অংশ এখানে বিধৃত হল।

আজ থেকে একশো বছর আগে, ১৯২৬ সালে রবীন্দ্রনাথের ইয়োরোপ সফর নিয়ে দেশ-বিদেশে বিতর্কের ঝড় উঠেছিল। আজও যেন সেই ঝড়ের প্রভাব পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। কারণ সেবারকার সফর নিয়ে কোথাও তেমন কোনো আবেগ বা উৎসাহ দেখা যায় না। বিশ শতকের বিশের দশকে ইতালিতে সাম্রাজ‍্যবাদী ফ‍্যাসিস্ট সরকারের আতিথেয়তা এবং সেখানে বেশ কিছু বক্তৃতার দেবার পর ইয়োরোপের অন‍্যান‍্য গণতান্ত্রিক দেশের বুদ্ধিজীবী মহলে কবির মানবতাবাদী ভাবমূর্তির অবনতি ঘটে।এই ঘাত-প্রতিঘাতের মধ‍্যেই সেবারের ইয়োরোপ সফরের শ্রেষ্ঠতম ফসল তিনি ফলিয়েছিলেন শুধুমাত্র তাঁর গানে।

সেবার বিদেশ সফররত অবস্থায় যতগুলি গান রচনা করেছিলেন, তেমনটি অন‍্য কোনো বিদেশ সফরে করেননি। সদ‍্য ছেষট্টি বছরে পদার্পণ করার পর শান্তিনিকেতন থেকে নবমবার সপরিবারে বিদেশ সফরের উদ্দেশে যাত্রা করেন ১২ মে ১৯২৬ সালে।

দীর্ঘ সাতমাসেরও অধিক সময়ে ইতালি, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, ফ্রান্স, ইংল‍্যান্ড, নরওয়ে, সুইডেন, ডেনমার্ক, জার্মানি, চেকোশ্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরি, ক্রোয়েশিয়া, যুগোশ্লাভিয়া, বুলগারিয়া, রোমানিয়া, গ্রিস প্রভৃতি দেশ সফর করেছিলেন। যাত্রার পূর্বে এপ্রিল মাসের শেষ দিনে ‘এ পারে মুখর হল কেকা ওই’ গানটি লিখেছিলেন। এরপর দীর্ঘ একশো তিরিশ দিন ‘ও পারে নীরব কেন কুহু হায়’-এর মতো তিনি নীরবই ছিলেন। অর্থাৎ মাঝের চার মাসে তাঁর হাত থেকে কোনো গান বের হয়নি। শরীর যে খুব ভালো ছিল তা নয়, তবে মনের মধ্যে একটা অস্থিরতা তো ছিলই। এই বিদেশ সফরের প্রথমেই তিনি ফ‍্যাসিস্ট মুসোলিনীর আতিথেয়তায় মুগ্ধ হয়েছিলেন বটে, পাশাপাশি ইতালির রাজনীতি ও ভাষার অজ্ঞতার কারণে ইয়োরোপে তাঁকে বড়ো সমালোচনার মধ‍্যে পড়তে হয়। স্বভাবতই এই কারণে কবির মনও অশান্ত ও ধ্বস্ত হয়। আমরা সেই যাত্রায় এসব বিতর্ক ভুলে তাঁর গানে অবগাহন করব। কারণ সেই সফরে রচিত গানগুলিরও শতবর্ষ উদযাপন এখন চলছে।

সফরের মাঝামাঝি সময়কাল। সেপ্টেম্বরের আট তারিখে রাতে কোপেনহেগন থেকে ট্রেনে চেপে হামবুর্গের উদ্দেশে যাত্রা করেন সপার্ষদ কবি।স্টকহলমে রাতে যখন বাল্টিক সাগরে অপেক্ষারত জাহাজটি হামবুর্গের দিকে ট্রেন সমেত সমুদ্রে চলতে থাকে, নীরব কবির মন তখন গানের জন‍্য ব‍্যাকুল হয়ে ওঠে। সাগরে ভাসমান জাহাজে ‍দ‍্যোদুল‍্যমান অবস্থাতে গান দিয়ে দ্বার খুলতে শুরু করলেন। গুনগুন করতে লাগলেন ট্রেনের কামরাতে বসেই। সেদিন ‘যায় চলে ওই-একলা রাতে’ রচনা করলেন ‘সে কোন্ পাগল যায়, যায় পথে তোর’ গানখানি।

সুর ভুলে যাওয়ার আশঙ্কায় পথের সাথী রানী মহলানবিশকে পাশের কামরা থেকে ডেকে এনে সুরটা শিখিয়ে দিয়েছিলেন। এই গানেই যেন বজ্রনির্ঘোষ ঘোষণা শোনা গেল তাঁর। লিখলেন, ‘বাঁধন-ছেঁড়ার মহোৎসবে / গান যে ওরে গাইতে হবে।’ সেবার সত‍্যি সত‍্যিই জার্মানির মাটির ‘নবীন আলোর বন্দনাতে’ একের পর এক গান তাঁর সফরকালে ‘অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলো’র মতো ধেয়ে আসতে লাগল। রবীন্দ্রজীবনীকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় কৌতূহল প্রকাশ করেছেন এই গানে কবি কি নিজের কথাই বললেন — তাঁর অন্তরের অভিপ্রায়!

পরের গানটি রচিত হল পরের দিন অর্থাৎ নয় সেপ্টেম্বর, হামবুর্গ শহরের আটলান্টিক হোটেলে বসেই লিখে ফেলেছিলেন, ভাষায় ভরা সুরের আবরণে ‘তোর পরানে কোন্ পরশমণির খেলা, / তাই হৃদগগনে সোনার মেঘের মেলা’। সেই পরশমণির খেলায় কার চোখের চাওয়ার হাওয়ায় কবির মন দোলায় কে জানে! এর আগেও কবির জীবনের একাধিকবার দেখা গেছে নাগাড়ে গানের ধারা বন‍্যার মতো ধেয়ে আসতে। তখন কেন এমন বিভিন্ন পর্যায়ের গান রচিত হত তা জানা সম্ভব হয় না।

একবার ‘নৌকাডুবি’ উপন্যাসটির প্রসঙ্গে চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন, ‘আমি তো কখনো আগে ভেবে চিন্তে কিছু লিখি না, লিখতে লিখতে যা হয়ে দাঁড়ায়।’ গানের বেলাতেও এমনটি হয় কিনা কেই বা জানে! তবে সেবারের সফরে তেজেশচন্দ্র সেনকে পত্রে লিখেছিলেন, ‘অন্তরে অন্তরে অসহ‍্য চঞ্চলতা অনুভব করি নিজের কাছ থেকেই উদ্দামবেগে পালিয়ে যাবার জন‍্যে।

পালাব কোথায়? কোলাহল থেকে সংগীতে।’ সুখে দুখে শোকে আবেগে স্মৃতিতে সংগীতের দরবারেই তিনি সব ছেড়ে পালিয়ে আসতেন। সেবারও তার ব‍্যতিক্রম হয়নি।

এইভাবেই জার্মানির বিভিন্ন শহরে যেমন মিউনিখে, পরপর চারটি গান লিখে ফেলেছিলেন। প্রথম গানটি বাঁধলেন ‘ছুটির বাঁশি বাজল যে ঐ নীল গগনে’। পিলু রাগের এই গানেই আছে তাঁর মুক্তির আকুতি, ‘সুর খুঁজে তাই শূন‍্যে তাকাই আপন-মনে’। পরের গান ‘আকাশ কোন্ রূপে মন চিনতে পারে’, সেখানে মুক্তির দিশায় প্রকৃতির কাছে এঁকে দিলেন এমন বাণী —‘আশ্বিনে এই অমল আলোর কিরণপারে / যায় নিয়ে কোন্ মুক্তিপারে!’ এই সময়ে মিউনিখে লেখা ‘তোর ভিতরে জাগিয়া কে যে’ এবং ‘নাই নাই ভয়, হবে হবে জয়’ দু’টি গানের মধ‍্যে বাঁধন ছেড়ার আহ্বান শোনা যায়। বারে বারে বিশ্বের অধিকার ফিরে পাবার আকুলতায় লিখলেন ‘স্থলে জলে তোর আছে আহ্বান, আহ্বান লোকালয়ে / চিরদিন তুই গাহিবি যে গান সুখে দুখে লাজে ভয়ে।’ এতদিনের সফরকালে আলোর পিয়াসি হয়েও তিনি গুমরে কেঁদে উঠেছিলেন , ‘যদি বাতাসে বহিল প্রাণ / কেন বীণায় বাজে না গান, / যদি গগনে জাগিল আলো / কেন নয়নে লাগিল আঁধি?’ মিউনিক থেকে কবি চললেন শিল্পনগরী ন‍্যুর্নবুর্গে। তারিখটি ছিল ১৮ সেপ্টেম্বর। পরদিন আবার গানের সুরের আসন পাতলেন, ‘আমার মুক্তি আলোয় আলোয়’। এবার দেহমনের সুদূর পারে নিজেকে হারিয়ে ফেলে উর্ধভাসে গানের সুরে মুক্তির কথা জানালেন মিশ্র কেদারায়। আর সেই গানেতেই ঘোষিত হল এই মুক্তি সর্বজনের মনের মাঝেও যে বড়ো সত‍্য। কুড়ি তারিখ ন‍্যুর্নবুর্গ শহর ত‍্যাগের প্রাক্কালে রচিত হল বিদায় ব‍্যথার ভৈরবী। এই ভৈরবীতেই কবির আহ্বান ছড়িয়ে পড়ে শিশিরশিহর শারদপ্রাতে শিউলিফুলের গন্ধেভরা বাঁশির কলতানে।

দেখা যাচ্ছে রবীন্দ্রনাথ মুক্তির গানে তখন একেবারে মোহিত হয়ে আছেন। সেপ্টেম্বরের একুশে, বন্ধুবর নীলরতন সরকারের বোন, প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশের মাতৃদেবী নিরোদবাসিনী দেবীর প্রয়াণতিথি উপলক্ষে স্টুটগার্টের হোটেলের ঘরেই উপাসনায় বসেন। অনেকদিন পর যেন প্রাণভরে উপাসনা করতে পারলেন প্রশান্তচন্দ্র ও রানী মহলানবিশকে সঙ্গে নিয়ে। এরপর সারাদিনের বক্তৃতা ও স্থানীয় মানুষজনের সঙ্গে কাটিয়ে দিনান্তে সন্ধ‍্যামেঘের শেষ প্রহরে সায়ন্তনের ক্লান্ত ফুলের গন্ধে ভাসতে ভাসতে অঙ্গবিহীন আলিঙ্গনে সকল অঙ্গ ভরে গেয়ে উঠলেন ‘মধুর তোমার শেষ যে না পাই প্রহর হল শেষ / ভুবন জুড়ে রইল লেগে আনন্দ-আবেশ।’

সর্বশেষ

জনপ্রিয়

আরও পরুন: