পারস্য থেকে ইরান: ইতিহাস, ধর্ম ও রাজনীতির দীর্ঘ ছায়া
পারস্য থেকে ইরান: ইতিহাস, ধর্ম ও রাজনীতির দীর্ঘ ছায়া
লেখক: আবিদ কাওসার
আজকের ইরানকে আমরা যে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বাস্তবতায় দেখি, তার পেছনে রয়েছে কয়েক হাজার বছরের ইতিহাস, উত্থান-পতন, বিশ্বাস ও ক্ষমতার লড়াই। এক সময়ের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী পারস্য সাম্রাজ্য মানব সভ্যতার ইতিহাসে প্রথম প্রকৃত সুপারপাওয়ার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। পূর্বে সিন্ধু নদ থেকে পশ্চিমে গ্রিস, দক্ষিণে মিশর পর্যন্ত বিস্তৃত এই সাম্রাজ্য শুধু ভূখণ্ডের দিক থেকে নয়, প্রশাসনিক দক্ষতা ও সাংস্কৃতিক সহনশীলতার দিক থেকেও ছিল অনন্য।
এই সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রধর্ম ছিল জরথুস্ত্র ধর্ম। এক স্রষ্টা—আহুরা মাজদা—এবং অশুভ শক্তির সঙ্গে নৈতিক সংগ্রামের দর্শন এই ধর্মকে আলাদা বৈশিষ্ট্য দিয়েছে। আগুনকে পবিত্রতার প্রতীক হিসেবে মানা, ‘গাহ’ নামে দিনে পাঁচবার প্রার্থনা, মৃত্যুর পর ‘টাওয়ার অফ সাইলেন্স’-এ শেষকৃত্য—সব মিলিয়ে এটি ছিল এক গভীর দার্শনিক ধর্মব্যবস্থা। আজ এর অনুসারী সংখ্যা অল্প হলেও ইতিহাসে এর প্রভাব ছিল ব্যাপক। ভারতের পার্সি সম্প্রদায় সেই ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী; তাঁদের মধ্যেই জন্ম নিয়েছেন শিল্পপতি রতন টাটা।
কিন্তু ইতিহাসের চাকা থেমে থাকে না। সপ্তম শতাব্দীতে খলিফা উমর ইবন আল-খাত্তাব-এর আমলে মুসলিম বাহিনী পারস্য আক্রমণ করে। কাদিসিয়ার যুদ্ধ এবং নিহাভন্দের যুদ্ধ সাসানীয় শক্তির পতনের পথ প্রশস্ত করে। জরথুস্ত্র ধর্ম রাষ্ট্রধর্মের মর্যাদা হারায়, ইসলাম ধীরে ধীরে প্রধান ধর্মে পরিণত হয়। কেউ স্বেচ্ছায়, কেউ সামাজিক-রাজনৈতিক চাপে নতুন বিশ্বাস গ্রহণ করে। ইতিহাসের এই রূপান্তর ছিল ধীর, কিন্তু গভীর।
তবে আজকের শিয়া-প্রধান ইরান সবসময় এমন ছিল না। ষোড়শ শতাব্দীতে শাহ ইসমাইল প্রথম সাফাভি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে দ্বাদশী শিয়া মতবাদকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করেন। এটি ছিল শুধু ধর্মীয় সিদ্ধান্ত নয়, রাজনৈতিক কৌশলও—সুন্নি অটোমান সাম্রাজ্য থেকে নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠার এক প্রচেষ্টা। এখানেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে—রাষ্ট্রীয় পরিচয় প্রায়শই ধর্মীয় ব্যাখ্যার মাধ্যমে রাজনৈতিক লক্ষ্য পূরণ করে।
বিশ শতকে এসে আরেকটি বড় মোড় নেয় ইরানের ইতিহাস। ১৯৭৯ সালের ইরানি ইসলামি বিপ্লব রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে ধর্মীয় নেতৃত্বাধীন শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে। আয়াতুল্লাহ রুহোল্লাহ খোমেনি-এর নেতৃত্বে ইরান নতুন আদর্শিক পরিচয় গ্রহণ করে। এই বিপ্লব কেবল একটি সরকারের পতন নয়; এটি ছিল রাষ্ট্র, ধর্ম ও জাতীয়তাবাদের নতুন সংজ্ঞা নির্ধারণ।
মজার বিষয়, বিপ্লবের আগে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের এক ভিন্ন ভূমিকায় ছিল। ১৯৫০ সালে ইরান ইসরায়েল-কে স্বীকৃতি দেয় এবং দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিল উষ্ণ। অথচ আজ তারা পরস্পরের প্রধান প্রতিপক্ষ। ইতিহাস এখানে আরেকটি সত্য স্মরণ করিয়ে দেয়—রাষ্ট্রীয় অবস্থান সময় ও ক্ষমতার সমীকরণে বদলে যায়।
এই দীর্ঘ পথপরিক্রমা আমাদের কী শিক্ষা দেয়? প্রথমত, ধর্ম স্থির হলেও তার রাজনৈতিক ব্যবহার পরিবর্তনশীল। দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্র যখন ধর্মকে নিজের পরিচয়ের কেন্দ্রে বসায়, তখন সেই পরিচয়ও ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে বদলে যেতে পারে। পারস্য থেকে ইরান—এই রূপান্তরের ইতিহাস তাই কেবল একটি দেশের গল্প নয়; এটি ক্ষমতা, বিশ্বাস ও জাতীয় স্বার্থের জটিল সমীকরণের দলিল।
ধর্ম মানুষের অন্তরের বিষয়। কিন্তু ইতিহাস দেখায়, রাজনীতি যখন ধর্মকে হাতিয়ার বানায়, তখন বিশ্বাস আর কেবল বিশ্বাস থাকে না—তা হয়ে ওঠে রাষ্ট্রীয় কৌশলের অংশ।
সম্ভবত এখানেই আমাদের সবচেয়ে বড় শিক্ষাটি লুকিয়ে আছে।





































