একজন মানিক পশারীর মৃত্যু, একাত্তরের অসমাপ্ত যুদ্ধ এবং ‘জয় বাংলা’র অমর চেতনা
একটি স্বাধীন দেশ কতটা অসহায় হলে সেই দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজি রাখা একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার কবর খুঁড়তে হয় রাতের অন্ধকারে? কতটা নির্মম হলে একজন বীরের শেষ বিদায়ের সময় তাঁর আপনজনদের বুকভরা কান্না আর মোবাইল ফোনের ক্ষীণ আলোই হয়ে ওঠে শেষ আশ্রয়?
এই প্রশ্ন শুধু একটি পরিবারের নয়। এই প্রশ্ন সমগ্র বাংলাদেশের, ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তে অর্জিত স্বাধীনতার, দুই লাখ নির্যাতিত নারীর আত্মত্যাগের এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের বাংলাদেশের।
বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর মৃত্যু আমাদের সামনে আবারও তুলে ধরেছে সেই কঠিন প্রশ্ন—যে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তে স্বাধীন হয়েছিল, সেই বাংলাদেশে একজন মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুর পরও কেন তাঁর সম্মান ও মর্যাদা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হবে?
১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক নেতৃত্বে যখন বাঙালি জাতি স্বাধীনতার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তখন মানিক পশারীর মতো অসংখ্য সাহসী সন্তান নিজেদের জীবনকে তুচ্ছ করে মাতৃভূমির মুক্তির জন্য লড়েছিলেন।
তাঁদের কাছে স্বাধীনতা ছিল না কোনো রাজনৈতিক সুবিধা, ক্ষমতার সিঁড়ি কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থ অর্জনের মাধ্যম। স্বাধীনতা ছিল মায়ের মুখের ভাষার মর্যাদা, মানুষের অধিকার, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং একটি শোষণমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন।
সেই স্বপ্নের মহান স্থপতি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আর সেই স্বপ্নের সবচেয়ে শক্তিশালী উচ্চারণ ছিল—‘জয় বাংলা’।
জয় বাংলা শুধু দুটি শব্দ নয়। এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়, পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার সাহস, মৃত্যুকে জয় করার প্রত্যয় এবং লক্ষ শহীদের রক্তে লেখা ইতিহাসের অমর উচ্চারণ।
যে স্লোগান বুকে ধারণ করে বাঙালি একদিন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল, সেই জয় বাংলার চেতনা আজও প্রতিটি মুক্তিযুদ্ধপ্রেমী মানুষের হৃদয়ে বেঁচে আছে।
বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারী সেই ইতিহাসেরই একজন প্রতিনিধি।
তিনি শুধু একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেই তাঁর দায়িত্ব শেষ করেননি। স্বাধীনতার বহু বছর পরও তিনি একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারপ্রক্রিয়ায় ভূমিকা রেখেছেন।
দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বাদী ও গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হিসেবে তিনি ইতিহাসের এক কঠিন অধ্যায়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। যে অপরাধের বিচার বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল, সেই বিচারপ্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি একাত্তরের স্মৃতি ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নকে সামনে এনেছিলেন।
একজন মানুষের পক্ষে যুদ্ধের ময়দানে অস্ত্র হাতে দাঁড়ানো যেমন সাহসের, তেমনি বহু বছর পর অতীতের অপরাধ নিয়ে আদালতে নিজের বক্তব্য তুলে ধরাও এক কঠিন দায়িত্ব।
মানিক পশারীর জীবন তাই আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—মুক্তিযুদ্ধ কেবল নয় মাসের একটি সশস্ত্র সংগ্রামের নাম নয়; মুক্তিযুদ্ধ হলো ইতিহাসের সত্য, ন্যায়বিচার এবং মানুষের মর্যাদা রক্ষার দীর্ঘ অঙ্গীকার।
কিন্তু কী নির্মম পরিহাস!
২০২৬ সালের ২৪ অক্টোবর এই বীর মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুর পর তাঁর রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও দাফনকে কেন্দ্র করে বাধা এবং উত্তেজনার অভিযোগ উঠে আসে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, তাঁর পরিবারের নারী সদস্যদের গভীর রাতে কবর খুঁড়ে তাঁকে দাফন করতে হয়েছে। যদিও দাফনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতাদের পক্ষ থেকে অস্বীকারও করা হয়েছে।
এই ঘটনাকে ঘিরে যে বিভক্তি ও বেদনাদায়ক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, সেটিই জাতির বিবেককে প্রশ্ন করার জন্য যথেষ্ট।
একজন মুক্তিযোদ্ধার শেষ বিদায় কোনো রাজনৈতিক বিরোধের বিষয় হতে পারে না। তাঁর প্রতি রাষ্ট্রীয় ও মানবিক সম্মান প্রদর্শন একটি স্বাধীন জাতির নৈতিক দায়িত্ব।
যে মানুষটি জীবদ্দশায় দেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের অংশ ছিলেন, মৃত্যুর পর তাঁর মর্যাদাকে ঘিরে এমন পরিস্থিতি কোনোভাবেই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
আজ মানিক পশারী আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো ইতিহাসের সামনে একটি বড় প্রশ্ন রেখে গেছে।
স্বাধীনতার পঞ্চান্ন বছর পরও কেন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদা এবং একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিয়ে সমাজে এত গভীর বিভক্তি?
বঙ্গবন্ধু যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেটি ছিল শোষণমুক্ত, অসাম্প্রদায়িক, মানবিক এবং মর্যাদাপূর্ণ একটি রাষ্ট্র। সেখানে মানুষের পরিচয় হবে তার অধিকার, স্বাধীনতা ও মানবিক মূল্যবোধে।
বঙ্গবন্ধুকে ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস লেখা যায় না। তেমনি জয় বাংলাকে বাদ দিয়ে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের আত্মাকে সম্পূর্ণভাবে উপলব্ধি করা যায় না।
বঙ্গবন্ধু একটি জাতিকে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, আর মুক্তিযোদ্ধারা সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছিলেন।
এই সত্য কোনো রাজনৈতিক পালাবদলে মুছে যাওয়ার নয়।
আজ যারা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ, বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক অবদান এবং জয় বাংলার চেতনাকে হৃদয়ে ধারণ করেন, তাঁদের জন্য মানিক পশারীর জীবন ও মৃত্যু একটি গভীর শিক্ষার বিষয়।
সেই শিক্ষা প্রতিহিংসার নয়, বরং ইতিহাসকে জানার, অন্যায়ের প্রতিবাদ করার, সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করার এবং আগামী প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস পৌঁছে দেওয়ার।
রাজাকারমুক্ত বাংলাদেশ বলতে শুধু কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ঘৃণা বোঝায় না। এর অর্থ একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের অস্বীকার, যুদ্ধাপরাধের মহিমাকীর্তন, সাম্প্রদায়িকতা এবং স্বাধীনতাবিরোধী চিন্তার বিরুদ্ধে ন্যায়বিচার, শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধের দৃঢ় অবস্থান।
কারণ মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা কখনো অন্ধ প্রতিশোধের শিক্ষা দেয় না। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের শিখিয়েছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে, মানুষের অধিকার রক্ষা করতে এবং সত্যকে মর্যাদা দিতে।
আজ মানিক পশারীর কবরের নীরব মাটি যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একজন মানুষকে মৃত্যুর মাধ্যমে থামিয়ে দেওয়া যায়, কিন্তু তাঁর জীবনের সংগ্রাম ও ইতিহাসের সাক্ষ্যকে মুছে দেওয়া যায় না।
মানিক পশারী শুধু একটি নাম নন; তিনি একাত্তরের সেই প্রজন্মের স্মারক, যারা স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করেছিলেন এবং পরবর্তী জীবনেও ইতিহাসের কঠিন প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি হয়েছিলেন।
তাঁর জীবনের ইতিহাস ও মৃত্যুর পরের বেদনাদায়ক ঘটনাগুলো নতুন প্রজন্মকে জানতে হবে। জানতে হবে কেন একটি জাতি মুক্তিযুদ্ধ করেছিল, কেন বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার প্রশ্নে আপসহীন নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এবং কেন জয় বাংলা বাঙালির মুক্তির সংগ্রামের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছিল।
আমাদের মনে রাখতে হবে, স্বাধীনতা শুধু একটি ভূখণ্ডের নাম নয়। স্বাধীনতা একটি দায়িত্ব, একটি নৈতিক অঙ্গীকার এবং শহীদের রক্তের কাছে চিরন্তন ঋণ।
যে জাতি নিজের মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান করতে জানে না, সে জাতির স্বাধীনতার চেতনা দুর্বল হয়ে পড়ে। আর যে জাতি তার ইতিহাসের সত্যকে রক্ষা করে, তাকে কোনো অন্ধকার চিরদিন আটকে রাখতে পারে না।
মানিক পশারী আজ চিরনিদ্রায় শায়িত। কিন্তু তাঁর জীবন ও শেষ বিদায়ের বেদনাময় স্মৃতি আমাদের বিবেকের দরজায় কড়া নাড়বে।
তাঁর স্মৃতির প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা হবে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে কোনো মুক্তিযোদ্ধাকে নিজের পরিচয়ের জন্য অপমানিত হতে হবে না; যেখানে একাত্তরের ইতিহাস বিকৃত হবে না; যেখানে ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও আইনের শাসন সবার জন্য সমানভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ মানে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো বাংলাদেশ। জয় বাংলার বাংলাদেশ মানে অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করা বাংলাদেশ। আর মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ মানে স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগ করা প্রতিটি মানুষের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখার বাংলাদেশ।
মানিক পশারীর মৃত্যু তাই শুধু শোকের নয়, ইতিহাসের কাছে আমাদের দায়িত্ব নতুন করে উপলব্ধি করারও মুহূর্ত।
একদিন রাতের অন্ধকারে তাঁর কবর খোঁড়া হয়েছিল। কিন্তু তাঁর জীবনের ইতিহাসকে অন্ধকারে ঢেকে রাখা যাবে না।
কারণ ইতিহাসের সত্যকে কবর দেওয়া যায় না।
বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক অবদান মুছে দেওয়া যায় না।
জয় বাংলার মুক্তির চেতনাকে নিঃশেষ করা যায় না।
বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
চিরজীবী হোক মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস।
চির অম্লান থাকুক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান।
জয় বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদা ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের প্রত্যাশায় রচিত বিশেষ মতামত কলাম।
আমিনুল হক ওয়েছ
যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা সন্তান।





































