বুধবার , ০৪ নভেম্বর ২০২৬
Wednesday , 04 November 2026
২০২৬৭ ২০২৬৩ ২০২৬১

প্রকাশিত: ০৪:৫৬, ৩ নভেম্বর ২০২৬

যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের অভিবাসী, বিশেষ করে স্কিলড ওয়ার্কার এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের জন্য এই পরিবর্তন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের অভিবাসী, বিশেষ করে স্কিলড ওয়ার্কার এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের জন্য এই পরিবর্তন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।


যুক্তরাজ্যের অভিবাসন আইনে বড় পরিবর্তনের পরিকল্পনা: স্থায়ী বসবাসের জন্য অপেক্ষা করতে হবে কত বছর?
আন্তর্জাতিক সংবাদ | যুক্তরাজ্য | ২ নভেম্বর ২০২৬

ফোকাস টিভি নিউজ ডেস্ক, যুক্তরাজ্য:

যুক্তরাজ্যের অভিবাসন নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের বিস্তারিত পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে ব্রিটিশ সরকার। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, অধিকাংশ বিদেশি কর্মীর স্থায়ী বসবাসের অনুমতি বা ইনডেফিনিট লিভ টু রিমেইন (ILR) পাওয়ার জন্য অপেক্ষার সময় পাঁচ বছর থেকে বাড়িয়ে দশ বছর করা হবে। তবে চিকিৎসক, নার্স, শিক্ষক, নির্দিষ্ট শর্ত পূরণকারী কেয়ার ওয়ার্কার এবং উচ্চ আয়ের কর্মীদের জন্য বিশেষ সুবিধা রাখা হয়েছে।

সোমবার, ২ নভেম্বর, পার্লামেন্টে নতুন 'আর্নড সেটেলমেন্ট' নীতির বিস্তারিত তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ। সরকারের বক্তব্য, যুক্তরাজ্যে স্থায়ী বসবাসের অধিকার নির্ভর করবে একজন অভিবাসীর কাজ, আয়, জাতীয় বিমায় অবদান, ইংরেজি ভাষার দক্ষতা এবং আইন মেনে চলার ওপর। 

নতুন নিয়মে কারা কত বছরে স্থায়ী বসবাসের সুযোগ পাবেন?
নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, বছরে এক লাখ ২৫ হাজার পাউন্ডের বেশি আয় করা ব্যক্তি এবং নির্দিষ্ট উচ্চদক্ষতাসম্পন্ন অভিবাসীরা তিন বছর পর স্থায়ী বসবাসের জন্য আবেদন করতে পারবেন।

অন্যদিকে, বছরে ৫০ হাজার ২৭১ পাউন্ডের বেশি আয় করা কর্মী এবং চিকিৎসক, নার্স ও শিক্ষকদের মতো নির্দিষ্ট সরকারি সেবামূলক পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের জন্য পাঁচ বছরের পথ বহাল থাকবে।

অধিকাংশ অন্যান্য কর্মীর ক্ষেত্রে স্থায়ী বসবাসের জন্য অপেক্ষা করতে হবে দশ বছর। আগের পরিকল্পনায় কিছু স্বল্পদক্ষ ও কম বেতনের কর্মীর জন্য ১৫ বছরের অপেক্ষার প্রস্তাব থাকলেও সংশোধিত পরিকল্পনায় তা কমিয়ে দশ বছর করা হয়েছে। 

কেয়ার ওয়ার্কারদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছাড়
নতুন ঘোষণায় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে যুক্তরাজ্যে আগে থেকে কর্মরত কেয়ার ওয়ার্কারদের ক্ষেত্রে।

করোনাভাইরাস মহামারির সময় যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা খাতে বিদেশি কর্মীদের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে সরকার জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়ে আসা কেয়ার ওয়ার্কারদের মধ্যে যাঁরা ভিসার শর্ত মেনে চলেছেন এবং বছরে অন্তত ২৫ হাজার পাউন্ড আয় করেছেন, তাঁরা পাঁচ বছর পর স্থায়ী বসবাসের আবেদন করতে পারবেন।

তবে যাঁরা এসব শর্ত পূরণ করেননি, তাঁদের জন্য নতুন পাঁচ বছরের ভিসার সুযোগ রাখা হবে। এর মাধ্যমে প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করে পরবর্তী সময়ে স্থায়ী বসবাসের আবেদন করার সুযোগ পাওয়া যাবে।

সরকার জানিয়েছে, অসাধু নিয়োগকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযানে প্রায় এক হাজার ৮০০ প্রতিষ্ঠানের বিদেশি কর্মী স্পনসর করার অনুমতি বাতিল করা হয়েছে। 

স্থায়ী বসবাস পেতে আরও কঠোর শর্ত
নতুন নিয়মে শুধু নির্দিষ্ট সময় যুক্তরাজ্যে বসবাস করলেই স্থায়ী হওয়ার অধিকার পাওয়া যাবে না। আবেদনকারীদের অপরাধসংক্রান্ত কঠোর শর্ত পূরণ, উচ্চমানের ইংরেজি ভাষার দক্ষতা প্রদর্শন, সরকারের কাছে বকেয়া ঋণ না থাকা এবং নির্ধারিত সময় জাতীয় বিমায় অবদানের প্রমাণ দিতে হবে।

এ ছাড়া অভিবাসন আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে স্থায়ী বসবাসের অপেক্ষার সময় অন্তত ২০ বছর হতে পারে। যাঁরা সরকারি ভাতা গ্রহণ করেছেন, তাঁদের আবেদন করার আগে টানা পাঁচ বছর সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভর না করার শর্তও রাখা হয়েছে। 

ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ।
শরণার্থীদের জন্য কী পরিবর্তন আসছে?
সরকারের নতুন পরিকল্পনায় শরণার্থীদের স্থায়ী বসবাসের নিয়মেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা হচ্ছে।

সরকার অনুমোদিত নিরাপদ ও বৈধ পথে যুক্তরাজ্যে আসা শরণার্থীরা পাঁচ বছর পর স্থায়ী বসবাসের আবেদন করতে পারবেন।

অন্যদিকে, অন্যান্য শরণার্থীদের ক্ষেত্রে সাধারণ অপেক্ষার সময় ২০ বছর হতে পারে। নির্দিষ্ট কর্মসংস্থান বা পড়াশোনার শর্ত পূরণ করলে তা কমে দশ বছর হতে পারে।

ছোট নৌকায় বা গোপনে যুক্তরাজ্যে প্রবেশকারীদের জন্য অতিরিক্ত দশ বছরের অপেক্ষার শর্ত রাখা হয়েছে। ফলে কিছু ব্যক্তিকে স্থায়ী বসবাসের জন্য ৩০ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে। 

আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন নিয়ম
বিদেশি শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও অভিবাসন নীতিতে পরিবর্তন আনা হচ্ছে।

২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে গ্র্যাজুয়েট ভিসার নতুন আবেদনকারীদের জন্য ভিসার মেয়াদ দুই বছর থেকে কমিয়ে ১৮ মাস করা হবে। তবে পিএইচডি ডিগ্রিধারীদের জন্য তিন বছরের মেয়াদ বহাল থাকবে।

এ ছাড়া নির্দিষ্ট ভিসার জন্য ইংরেজি ভাষার দক্ষতার শর্ত ইতিমধ্যেই কঠোর করা হয়েছে। ২০২৭ সালের মার্চ থেকে বিভিন্ন স্থায়ী বসবাসের আবেদনের ক্ষেত্রেও উচ্চতর ইংরেজি দক্ষতার নিয়ম কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। 

আগে থেকে যুক্তরাজ্যে বসবাসকারীদের কী হবে?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নতুন সেটেলমেন্ট নীতি শুধু ভবিষ্যতে যুক্তরাজ্যে আসা ব্যক্তিদের জন্য সীমাবদ্ধ থাকবে না। যাঁরা ইতিমধ্যে দেশটিতে আছেন কিন্তু এখনও স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পাননি, তাঁদের অনেকের ক্ষেত্রেও নতুন নিয়ম প্রযোজ্য হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

তবে যাঁরা ইতিমধ্যে ILR বা স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পেয়েছেন, তাঁদের সেই মর্যাদা বাতিল করা হবে না।

ব্রিটিশ নাগরিকদের নির্দিষ্ট পরিবারের সদস্য, হংকংয়ের ব্রিটিশ ন্যাশনাল ওভারসিজ ভিসাধারী এবং সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের জন্য বিদ্যমান কিছু বিশেষ পথ বহাল থাকবে। 

সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রতিক্রিয়া
সরকারের দাবি, নতুন নীতি অভিবাসন ব্যবস্থাকে আরও নিয়ন্ত্রিত করবে এবং যাঁরা ব্রিটিশ অর্থনীতি ও সমাজে অবদান রাখছেন, তাঁদের স্থায়ী বসবাসের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেবে।

তবে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন, অভিবাসন আইন বিশেষজ্ঞ এবং রাজনৈতিক মহল থেকে এই পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সমালোচকদের আশঙ্কা, ইতিমধ্যে যুক্তরাজ্যে জীবন ও ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা বহু অভিবাসী দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হতে পারেন।

অন্যদিকে, কেয়ার ওয়ার্কারদের জন্য পাঁচ বছরের বিশেষ সুবিধা রাখার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠন। 


কবে থেকে কার্যকর হবে?
সরকারের ঘোষিত নতুন স্থায়ী বসবাসের সংস্কারগুলো ২০২৭ সালে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সব বিধানের চূড়ান্ত কার্যকারিতা ও নির্দিষ্ট তারিখ সংশ্লিষ্ট অভিবাসন বিধি প্রকাশের ওপর নির্ভর করবে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, নতুন ব্যবস্থায় পাঁচ লাখের বেশি অভিবাসীর স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পাওয়ার সময় পিছিয়ে যেতে পারে।

যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের অভিবাসী, বিশেষ করে স্কিলড ওয়ার্কার এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের জন্য এই পরিবর্তন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। 


ফোকাস টিভি, যুক্তরাজ্য।

তথ্যসূত্র: UK Home Office, UK Parliament House of Commons Library, Reuters ও Associated Press। প্রতিবেদন প্রস্তুত: ২ নভেম্বর ২০২৬।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়

আরও পরুন: